সবার মুখে মুখে একটা কথা প্রচলন আছে যে “প্রচারেই প্রসার”। তার মানে মার্কেটিং যার যত ভালো তার সেল বাড়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে। এ কথা আসলে সবাই জানেন। কিন্তু মার্কেটিং এর কৌশলে আছে ঘাটতি এবং কিছু ভ্রান্ত ধারণা।
কিছু পয়েন্ট, কিছু প্রশ্ন, কিছু আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে বর্ণনা করার চেষ্টা করি চলুন। ৫ মিনিট পড়ুন আশা করি একটা ধারণা পাবেন। একটু গল্পও করে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করেছি ধৈর্য নিয়ে পড়ুন।
১। কনটেন্ট বা বর্ণনাকে ভুল ভাবে উপস্থাপন
সবাই জানেন ডিজিটাল মার্কেটিং বা অনলাইন ওয়াল্ডে কনটেন্ট হল রাজা। কেন রাজা ? আসলে ডিজিটাল মার্কেটিং এর কনসেপ্টই হল আপনি যেহেতু সব কাস্টমারের সাথে ডিরেক্ট কথা বলতে পারবেন না। তার মানে আপনার কনটেন্ট যেন আপনার পক্ষ থেকে কাস্টমারের সাথে ইন্টারেক্ট করতে পারে।
ধরুন আপনি যদি বলেন “আমার প্রোডাক্ট ভালো আপনি / আপনারা কিনুন”। আচ্ছা ভেবে দেখুন এমন কোন প্রোডাক্টের বর্ণনা হলে আপনি কিনতেন কিনা ???
মনে করুন, আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। দুইজন বিক্রেতা যারা কিনা আপনার কাছে তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে চায়। প্রথমজন, হঠাৎ আপনাকে কোন কিছু কেনার জন্য ডিরেক্ট বললো। তাহলে কি আপনি কিনবেন ? আবার মনে করুন দ্বিতীয়জন, আপনাকে ভালো ভাবে সম্বোধন করলো, অভিবাদন জানালো, কোন একটা সমস্যার কথা বললো, তার সমাধান হিসাবে আপনাকে একটা প্রোডাক্ট দেখালো এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ গুণাগুণ তুলে ধরলো।
এবার বলুন আপনি কার কাছ থেকে পণ্য কিনবেন? অবশ্যই দ্বিতীয় জনের কাছ থেকে কিনবেন।
২। পেইজের নাম, ইউজার নেম, লোগো, কভার, ছবি, ভিডিয়ো সব কিছুতেই অসামঞ্জস্যতা
মনে করেন পেইজের নাম দিলেন বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না আর বিক্রি করেন মাছ বা ইলেকট্রনিক্সের জিনিস। আবার পেজের নামের সাথে ইউজার নেমের কোন মিল নাই। সেই সাথে আপনার লোগো এবং কভার পিক আপনার ব্যবসাকে ঠিকভাবে উপস্থাপন করে না। তাহলে কি আসলেই হবে???
মনে করেন আপনি মাছ বিক্রি করেন। তাহলে তো অবশ্যই আপনাকে মাছের সাথে সম্পর্কিত নাম, ইউজার নেম, বর্ণনা, অরিজিনাল ছবি বা ভিডিয়ো দিতে হবে। কিন্তু আপনারা অনেকেই ছবি বা ভিডিয়ো অন্য কোন পেইজ থেকে চুরি করেন, অথবা ফটোশপে এমন ভাবে এডিট করেন যে দেখে মনে হয় আর্টিফিশিয়াল মাছ। এবার আপনি বলুন তো এভাবে হলে আপনি নিজে কিনতেন কি-না?
অবশ্যই ভালভাবে উপস্থাপনের জন্য গ্রাফিক্স ডিজাইন বা মোশন গ্রাফিক্স ভিডিয়ো দরকার হবে। তবে সেটা বাস্তবসম্মত, রুচিশীল, আকর্ষণীয় এবং দক্ষ হাতের কাজ হতে হবে।
শুধুমাত্র ছবি আর লেখা আপলোড করলেই হবে না, সেই সাথে ভিডিয়ো আপলোড করতে হবে এবং লাইভ করতে হবে।
৩। নেটওয়ার্কিং এর দূর্বলতা
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, “না কাঁদলে মাও দুধ দেয় না”। মনে করেন আপনি অ্যামাজন বনের ভেতর খুব ভালো, সুন্দর, ও আধুনিক দোকান খুলে বসে আছেন। তাহলে আপনার দোকানে কি কোন মানুষ যাবে ? আর যদি যায়ও তাহলে সেটা ভুলক্রমে।
এই জন্য আপনাকে অবশ্যই অন্যদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। ফেইসবুক পেজে, গ্রুপে, ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াট’স এ্যাপে, ইমোতে, অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াতে, অফলাইনে অন্যদের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তবে সাবধান কাউকে সরাসরি কোন কিছু কেনার কথা বলবেন না। কেন বলবেন না সেটা উপরের পয়েন্টে উল্লেখ করেছি সেটা অবশ্যই পড়েছেন।
আপনাকে আপনার এক্টিভিটি দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যেমনঃ বিভিন্ন ইভেন্ট পরিচালনা করা, অফার দেওয়া, গিফট দেওয়া, স্পেশাল ছাড় দেওয়া, লাইভে ইন্টারেক্ট করা, ক্লায়েন্টদের বিভিন্ন উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো, ইনফ্লুয়েন্সারদের অন্তভূক্ত করা ইত্যাদি।
ভালো ও বিনয়ী ব্যবহার, সততা আপনাকে অবশ্যই সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে দিবে।
৪। ডিজিটাল মার্কেটিং সম্পর্কে অজ্ঞানতা
আগে যারা অফলাইনে মার্কেটিং করতেন তাঁদের সময় এসেছে ডিজিটাল মার্কেটিং এ মনোনিবেশ করা। আগে মনে করেন যুদ্ধ হতো লাঠি-ঠেঙ্গা, দা-বটি, তরবারি নিয়ে আর এখন সেটা হয় সাইবার এটাক্টের মাধ্যমে। বুঝে গেছেন তাহলে পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে না পারলে হারিয়ে যেতে হবে অতল গহ্বরে।
ডিজিটাল মার্কেটিং এর অল্প কিছু পার্ট উল্লেখ করি চলুন।
সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য অর্গানিক ও পেইড ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করতে হবে।
অর্গানিক মার্কেটিং বলতে কি বোঝায় তাই তো?
আপনার জন্য প্রফেশনাল ভাবে ছবি অথবা ভিডিয়ো সহ গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা উপস্থাপন করতে হবে যেন আপনার টার্গেট অডিয়েন্স আকর্ষণ অনুভব করে। বিভিন্ন গ্রুপে, নিজের টাইমলাইনে, স্টোরিতে পোষ্ট করতে হবে। অন্যের পোষ্টে বিনয়ের সাথে কমেন্ট করতে হবে এবং নিজের পোষ্টে কেউ কমেন্ট করলে বা ইনবক্স করলে বুদ্ধিমত্তার সাথে রিপ্লাই করতে হবে। এভাবেই আপনার নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হবে।
পেইড মার্কেটিং তাহলে কী?
অনেকেই মনে করেন মাস্টার কার্ড বা ভিসা কার্ড বা পেপাল ইত্যাদি থেকে ডলার খরচ করে বুষ্টিং করলেই পেইড মার্কেটিং। আসলে বুষ্টিং করার জন্য যে সমস্ত প্রক্রিয়া আছে সেগুলো অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে।
ধরে নিন, আপনার বাবা একজন সফল ব্যবসায়ী এবং সে অনেক পরিশ্রম করে বড় হয়েছে। এবার সে যদি আপনাকে ১ কোটি টাকা দিয়ে বলে ব্যবসা করো তাহলে কি আপনি আসলেই ব্যবসা করতে পারবেন ??? টাকা দিয়ে টাকা আনা যায় এটা সঠিক তবে সেই টাকা থাকতে হবে দক্ষ মানুষের কাছে যে কিনা প্রতিটা টাকার লাভ-ক্ষতি সুন্দর ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে পারবে।
এই জন্য সুন্দর মত ডেমোগ্রাফিক্স সেট করতে হবে দক্ষতার সাথে যাতে নির্দিষ্ট অডিয়েন্সকে টার্গেট করা যায়। যার ব্যবসা এবং সেই সম্পর্কিত ডাটা সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকবে সে সঠিক বাজেট এবং সময় নির্ধারণ করে এ্যাড পরিচালনা করতে পারবে।
ওয়েবসাইটের জন্যও অর্গানিক ভাবে সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন(SEO) করতে হবে। যদিও টার্গেট কী-ওয়ার্ড সাপেক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে করতে হয় এটি। তবে সময় বেশি লাগলেও এটি দীর্ঘ সময় ranking ধরে রাখতে এবং গুগল সার্চে প্রথম পেজে থাকতে সহায়তা করে।
ওয়েবসাইটের জন্যও পেইড ভাবে সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং(SEM) করতে হবে। তাহলে দ্রুত সময়ের ভেতর অনেক মানুষের কাছে বা টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছানো যাবে এবং গুগল নিজ উদ্যোগে আপনার জন্য মার্কেটিং করবে।
৫। অনলাইন বিজনেসের গ্রোথ হ্যাক এর জন্য স্পেশালিষ্ট আইটি ফার্মের সাথে সংযোগহীনতা
আচ্ছা ছোট বেলায় তো আপনাদের গণিত বই আর গণিতের সমাধান গাইড দুইটাই ছিল তাও কেন গণিতের শিক্ষকের কাছে গণিত শিখতে যেতেন? উত্তরটা আসলে খুব কঠিন কিছু না। ভালো করে বোঝার, শেখার এবং ভেতরের গভীরতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবার জন্য।
তাহলে এতো দিন আপনারা যারা অফলাইনে বিজনেস করেছেন তাঁরা যদি অনলাইনে সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা না থাকে তবে কি তাঁদের স্পেশালিষ্ট আইটি ফার্মের কনসালটেন্সি দরকার ? অবশ্যই দরকার।
ডাক্তার যেমন রোগী দেখে প্রেসক্রিপশন দেয় তেমনি আইটি ফার্মও আপনার অবস্থা ও ব্যবসা বুঝে আপনার অনলাইন উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কী দরকার, কেন দরকার, কখন দরকার সব ঠিক করে সেট করে দিবে।
একজন দক্ষ শিক্ষক যেমন বুঝে তার ছাত্র-ছাত্রীর কখন কী প্রয়োজন তেমনি দক্ষ আইটি ফার্ম জানে আপনার অনলাইন বিজনেস গ্রোথের জন্য কী কী প্রয়োজন।

